লড়াই করে বাঁচার নামই জীবন

২১

এমন একাকী কালো আঁধার পেরিয়ে সুবেহ সাদিকের বর্ণরেখায় আমিও পেয়েছি পৃথিবীর পথে হাঁটার আলো। নিতান্তই ক্ষুদ্র মানুষ আমি। এই যন্ত্র নগরীর এককোণে একাকী সংসার। মাথার ভেতর সংবাদের নেশাটা লেপ্টে আছে বলে সেটা থেকে নিজেকে আলাদা করতে পারি না।

সংবাদের সঙ্গে আছি বলেই চীনের উহান থেকে করোনাকে জানতে শুরু করি। করোনায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ, বাড়ছে লাশের সারি পৃথিবীজুড়ে বাড়ছে কান্নার জোয়ার। মানুষের কোলাহলে মুখর বিশ্ব এখন নীরব, বেদনার আহাজারিতে আচ্ছন্ন।

আতঙ্ক আর উদ্বেগের দিন গুনতে গুনতে সীমানা পেরিয়ে দেশেও হানা দিল কোভিড-১৯ এর কালো থাবা। সংবাদের শ্রমিক আমি। তাই ভয়ের চৌহদ্দি পেরিয়ে করোনাকালেও দৌড়াই মাঠে। কী এক যুদ্ধ যুদ্ধ দিন! কফিন আর লাশ গোনাই যেন এখন কাজ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রতিদিন লাশের সংখ্যা গুনে শঙ্কা নিয়ে ঘরে ফিরি। ঘর কোথায়? দু’কামরার ভাড়া বাসা। একাই থাকি ঘরে। মাথার মধ্যে করোনা, লকডাউন, মৃত্যু, লাশ এসব নিয়েই বিছানায় চোখ মুছি। ভাবি, এই বুঝি করোনার করাল থাবা গ্রাস করল। দেরি হলো না, অবশেষে কোভিড-১৯ ঠিকই কামড়টা বসাল আমার শরীরে।

দ্বিতীয় রোজায় ঘরে ফিরে শরীর ব্যথা, গায়ে জ্বর বোধ হচ্ছে। একা মানুষ, শরীর খারাপের কাউকে বলার মতো কেউ নেই। তা ছাড়া ঢাকার বাড়িতে প্রতিবেশী মানে অচেনা মানুষ। ব্যস্ততায় তাদের চেনাও হয়নি সেভাবে। রাতের সঙ্গে জ্বরের মাত্রাও বাড়ল। থার্মোমিটারে জ্বর তখন ১০০ ডিগ্রি। সংবাদের কারণে করোনায় করণীয় যা যা জানি, সে অনুযায়ী গরম পানির ব্যবহার শুরু করলাম। প্যারাসিটামল খেয়ে শুয়ে পড়লাম। মাথায় আসল চিন্তা। মনে অনায়াসে ভয় ঢুকে পড়েছে।

ঘুম হয়নি তেমন, সেহরিতে উঠে দেখি গা কাঁপছে। জ্বর বাড়ছে। পুরোদিন গেল ১০১ জ্বর নিয়ে। আমি একা, লকডাউনে হোটেলও বন্ধ। রমজান চলছে। জ্বর নিয়ে নিজেই খিচুড়ি আর ডিম সেদ্ধ করলাম। সুস্থ হওয়ার তাগিদ অনুভব করলাম। গরম পানি লেবু আদা, কালিজিরা, লবঙ্গ, মধু জলে গার্গল করছি। সেই তপ্ত জল চায়ের মতো খেয়ে যাচ্ছি ঘণ্টায় ঘণ্টায়। জ্বর আরো বেড়ে ১০২ হলো।

বড় ভাই ডাক্তার নূরুল আমিন রাজধানী থেকে পড়াশোনা শেষে গ্রামের মানুষের সেবায় কাজ করেন দূরের শহরে। ফোন দিয়ে তাঁকে জানালাম সবকিছু। ওষুধ লিখে পাঠালেন মুঠোফোনে। গা কাঁপা জ্বর আর সুরক্ষা পোশাক পরে চারতলা ডিঙিয়ে নিজেই আনলাম ওষুধ।

এরপর নিজের কর্মস্থলে জানালাম সব। সহমর্মিতা জানিয়ে পাশে থাকার দুরন্ত সাহস জোগাল এনটিভি পরিবার। ক্রমেই জ্বর বেড়ে চলছে। রাতের আঁধার কিংবা দিনের আলো এখন আর তেমন ব্যবধান দেখি না। তীব্র জ্বরের ঘোর। চতুর্থ দিনে ১০৪ ডিগ্রি জ্বর। এই নিঃসঙ্গ ঘরে, একাই চলতে লাগলাম। খিচুড়ি করি, ডিম ভাজি। জ্বরের ঘোরে কখনো কখনো বিছানায় পড়ে থাকি সংজ্ঞাহীন হয়ে। ফের সংজ্ঞা ফিরে এলে, গরম জলে ভাঁপ নিই। রসুন, আদা, কালিজিরা, সরিষার তেল, লবঙ্গ, লেবু একত্রে সিদ্ধ করে সে জলের ভাঁপ নাক দিয়ে টানছি ফুসফুসের দিকে। কিছুটা ঘেমে জ্বর ছাড়ে।

প্যারাসিটামল আর অ্যান্টিবায়োটিক এজিথ্রোমাইসিন শুরু করেছি। ডাক্তারের সঙ্গে ফোন ও মেসেঞ্জারে চলে যোগাযোগ। তীব্র জ্বর নিয়ে খাবারের প্লেট-হাঁড়ি ধুয়ে রেখে শরীর ফেলে দিই বিছানায়। মনে মনে ভাবি বেঁচে থাকতে হবে। ভাবি এই কঠিন সময় কাটিয়ে আবারও সংবাদের মাঠে ফিরতে হবে।

কিছুদিন পর জ্বরের সঙ্গে যোগ হয় তীব্র গলাব্যথা, খুশখুশে কাশি৷ কোভিড-১৯ টেস্ট করে ফল এলো ‘পজিটিভ’। একা ঘরে ভয়ের পারদ আরো বেড়ে গেল। এবার বাড়িতে জানালাম, স্বজনেরা উদ্বেগ, কান্নায় মূর্ছা গেল। এই নগরে করোনার কথা শুনলে আমার কাছে কেউ আসবে না জানি। মা ও স্ত্রী স্বজনরা দূরের শহরে কাঁদছে। লকডাউনেও তারা ছুটে আসতে চেয়েছে। আমার স্ত্রী তো আসার জন্য পুলিশের অনুমতিপত্র জোগাড় করেছে। আমি বারণ করে বলেছি, এলে সবাই একসঙ্গে মৃত্যুর মুখে পড়ব।

জ্বর, গলাব্যথা কাশি বাড়তেই থাকল। এই ঘোরেই একা ঘরে রান্না করি, থালাবাসন ধুই, কাপড় কাঁচি৷ আবার ফের সংজ্ঞাহীনের মতো পড়ে থাকি বিছানায়। চার দেয়াল বন্দি আমাকে যেন ঘরের দেয়ালগুলো ঘন হয়ে কবরের মতো ঘিরে ফেলছে।

দশম দিনে শুরু হলো শ্বাসকষ্ট। সে কি তীব্র যন্ত্রণা। ফুসফুসের বায়ুথলিগুলো করোনার নীল বিষে উপচে পড়ছে। দম বন্ধ হয়ে আসে একলা ঘরে। কাকে ডাকব? প্রিয় মানুষগুলো তো অনেক দূরের শহরে তখন খবরের অপেক্ষায়।

অফিস থেকে সাহস দেওয়া হলো। দূর দেশ থেকেও এনটিভির চেয়ারম্যান ফোনে কুশলাদি জেনে সকল সহযোগিতার কথা জানালেন, সাহস জোগালেন। স্ত্রী, মমতাময়ী মা-বাবা ভাইবোন সবাই খুব চিন্তিত। আমি একা ঘরে দম বন্ধ করে জীবন-মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে।

একবার যেন দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। হাসপাতালে যেতে বলল বন্ধুরা। উদ্বেগে ঘামতে থাকি। ভাবি বাঁচতে হবে, ফিরতে হবে। ফের উষ্ণ জলের ভাঁপ নিই। সময় গড়িয়ে রাত নামে। ধীরে ধীরে দমে কিছুটা স্বস্তি ফিরলে হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পাল্টাই। পরের দিন শ্বাসকষ্টের সঙ্গে শুরু হলো আমাশয়-ডায়রিয়া। রাইস আর ওরস্যালাইন খেলাম একটানা।

অনেক প্রিয় মানুষরা খাবার পাঠাল। সিঁড়ি ভেঙে ঘোরের মধ্যে চারতলায় সেগুলো তুলে নিয়ে আসি। বাড়িওলা জানলে বাড়ি ছাড়তে বলবে, তাই সেদিকেও ভয় ছিল।

চুপচাপ একাকী একটা ঘরে করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করলাম আমি। রাত নেমে এলে মনে হয় মৃত্যুও মাথার কাছে এসে বসে থাকে। সাহসে বুক বাঁধি। মহান রবের কাছে প্রার্থনায় অবনত হই৷ আদা-লবঙ্গের ভাঁপে দম নিতে আরাম হয় বেশ। নেবুলাইজার দিয়ে যায় বড় বোন। ইনহেলার-নেবুলাইজারে জীবন খুঁজি। মন্টিলুকাস্ট আর ডক্সোফাইলিন যোগ হলো ওষুধের তালিকায়। টানা ১৪ দিন চার দেয়ালের ঘরে চলে যমে মানুষে টানাটানি।

এর মধ্যে করোনায় মানুষের মৃত্যুর খবর তো পাচ্ছিলাম প্রতিদিন। রাত গভীর হলে চোখে ভেসে ওঠে সারি সারি লাশের ছবি। ক্লান্তিতে চোখ ভেঙে আসে, তবুও ঘুম হয় না। শরীর দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। আবার ডায়রিয়ার কারণে শক্তিশালী খাবারও খেতে পারছি না। ১৬ দিনের মাথায় কিছুটা স্বস্তি বোধ করি। জ্বর কমতে থাকে। তার পরের দিন কমে গলাব্যথা। ডায়রিয়া কমেছে আরো অনেকদিন পর। আর কাশি-শ্বাসকষ্ট কমেছে তারও পর। সাহসে বুকটা ফুলে উঠে। মনোবল দ্বিগুণ হয়। ফোনে বেঁচে উঠবার সাহস জোগায় অফিস, বন্ধু, স্বজন ও মা। রান্না করা খাবার পৌঁছে দিয়ে ঋণের জালে জড়িয়েছেন ভালোবাসার মানুষরা।

মানুষের সহযোগিতা আর আল্লাহর ইচ্ছায় আস্তে আস্তে সুস্থতার পথে হাঁটতে শুরু করি। আমি দেখি এই ঘুপচি গলির শহরেও আমার আঁধার ঘরের জানালা দিয়ে রোদের আলো ঝলমল করছে। এই জ্বর, ডায়রিয়া আর শ্বাসকষ্টেও প্রতিদিন ডিটারজেন্টে কেঁচেছি গায়ের পোশাক, বিছানা, বালিশ কাঁথা পরিষ্কার করেছি। ঘরে জীবাণুনাশক ছিটিয়েছি। সাবান দিয়ে হাত ধুয়েছি বারবার। একটি আলাদা ঝুড়িতে জমিয়েছি টিস্যুসহ নিজের ব্যবহৃত জিনিস। ধীরে ধীরে পাল্টায় পরিবেশ। সংজ্ঞাহীন খুঁড়িয়ে চলা আমি এখন ঘরের মেঝেতে হাঁটছি। ভিটামিন সি খাই, যোগ ব্যায়াম করি, দম নেই প্রাণ ভরে।

ধীরে ধীরে সব অন্ধকারের পর্দা সরে যেতে থাকে। আলো আসছে যেন, অনেক আলো। নাকে গন্ধ পেতে শুরু করি। যেন বেঁচে থাকবার সুবাস পাই। আবার পৃথিবীর পথে হাঁটবে ভেবে মৃত্যুকে পেছনে রেখে এগোতে থাকি এক পা-দুই পা করে।

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.